২৮ অক্টোবর ২০২৬, বুধবার, ১০:৩১:১১ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
যেভাবে নিজ কার্যালয়ে ‘মা`র`ধ`রে`র’ শি`কা`র হলেন আইইডিসিআর পরিচালক
  • আপডেট করা হয়েছে : ২৮-১০-২০২৬
যেভাবে নিজ কার্যালয়ে ‘মা`র`ধ`রে`র’ শি`কা`র হলেন আইইডিসিআর পরিচালক

সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) পরিচালক অধ্যাপক ডা. কাজী আহমেদ জাকিকে তার কার্যালয়ে একটি বৈঠক চলাকালে টেনেহিঁচড়ে বের করে মারধরের অভিযোগ উঠেছে বিএনপিপন্থি চিকিৎসকদের সংগঠন ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) নেতাদের বিরুদ্ধে।


বুধবার (২৮ অক্টোবর) বেলা ১১টার দিকে আইইডিসিআরের কার্যালয়ে এ ঘটনা ঘটে। ওই সময় সেখানে বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে একটি বৈঠক চলছিল।


প্রত্যক্ষদর্শী ও কার্যালয়ের একাধিক কর্মকর্তা জানান, বৈঠক শুরুর প্রায় পাঁচ মিনিটের মাথায় ড্যাবের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-আইনবিষয়ক সম্পাদক ডা. জাহিদ হাসানসহ ৮ থেকে ১০ জন ওই কক্ষে প্রবেশ করেন। এরপর বৈঠকে চেয়ারে বসে থাকা পরিচালক অধ্যাপক ডা. কাজী আহমেদ জাকিকে টেনেহিঁচড়ে কক্ষের বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে সেখানে উপস্থিত ব্যক্তিরা তাকে মারধর করেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ সময় বিদেশি প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন। 


আইইডিসিআরের কার্যালয়ের সিসিটিভি ফুটেজে পরিচালককে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাওয়ার পর মারধরের দৃশ্য দেখা গেছে। প্রত্যক্ষদর্শী ও কার্যালয়ের কর্মরত একাধিক কর্মকর্তা ঢাকা পোস্টকে বলেন, পরিচালককে কক্ষের ভেতর থেকে বাইরে নিয়ে আসার পরও মারধর করা হয়। কোনো ধরনের কথাবার্তা ছাড়াই তাকে মারধর করা হয়েছে। তাদের ভাষ্য, এ ঘটনায় প্রায় ৬০ থেকে ৭০ জনের মতো লোকজন সেখানে এসেছিলেন। ডা. জাকির মাস দুই আগেই আইইডিসিআর এর ফিল্ড ইপিওডিমোওলজি ট্রেনিং প্রোগামের (এফইটিপি) প্রজেক্ট ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। 


ঘটনার সময় উপস্থিত থাকা ওয়ান হেলথ বাংলাদেশের জাতীয় সমন্বয়ক অধ্যাপক ড. নিতীশ চন্দ্র দেবনাথ বলেন, ‘আমি মিটিংয়ে একটু পরে যোগ দিয়েছি। মিটিংয়ে প্রবেশ করার কিছুক্ষণের মধ্যেই ৮ থেকে ১০ জনের মতো লোক কক্ষে প্রবেশ করে ডা. জাকিকে টেনেহিঁচড়ে মিটিং থেকে বের করে নিয়ে যান। এটি ইউএসএআইডির ইউএনজির প্রোগ্রেসিভ মিটিং ছিল।’


এ ঘটনায় ড্যাবের পক্ষ থেকে ডা. জাহিদ হাসানের সদস্যপদ প্রাথমিকভাবে স্থগিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে তার বিরুদ্ধে কেন সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে না, সে বিষয়ে আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ড্যাবের সভাপতি ও মহাসচিবের কাছে যথোপযুক্ত জবাব দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।


ড্যাবের সিনিয়র সহসভাপতি অধ্যাপক ডা. মো. আবুল কেনান বলেন, ‘আমরা এ ধরনের কর্মকাণ্ডকে সমর্থন করি না। স্বাস্থ্য খাতের সব পর্যায়ে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে ড্যাব সব ধরনের সহযোগিতা করবে। ড্যাবের কোনো সদস্য অনিয়ম, উগ্রপন্থা বা এ ধরনের হস্তক্ষেপের সঙ্গে জড়িত থাকলে আমরা তা কোনোভাবেই প্রশ্রয় দেবো না, বরদাস্ত করব না। এ ঘটনায় ডা. জাহিদের সাংগঠনিক পদ স্থগিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রেও ড্যাব সর্বাত্মক সহযোগিতা করবে।’


ঘটনাটি তদন্তে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. জাহিদ রায়হান। তিনি বলেন, এ ঘটনাটি পুরোপুরি অনাকাঙ্ক্ষিত। কার্যালয়ের ভেতরে এ ধরনের ঘটনা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া সম্ভব নয়। তদন্ত সাপেক্ষে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


এ ঘটনাকে ন্যক্কারজনক হিসেবে আখ্যায়িত করে আইইডিসিআর এর সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, আইইডিসিআর এর মতো একটি প্রতিষ্ঠানে প্রবেশ করে ড্যাবের নেতাকর্মীদের হাতে যে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার সূচনা হলো এটা খুবই নিন্দনীয় ও জঘন্য একটি কাজ হয়েছে। সরকারের কাছে অনুরোধ করছি, এ ঘটনায় যারা সম্পৃক্ত তাদের বিরদ্ধে তদন্ত সাপেক্ষে যেন আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।


এ বিষয়ে বিস্তারিত কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি সংস্থাটির পরিচালক অধ্যাপক কাজী আহমেদ জাকি। তবে ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে  বলেন, ‘আজ আমার কার্যালয়ে এমন ঘটনা ঘটেছে। আমি মারধরের শিকার হয়েছি।’


এদিকে সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান এ ঘটনার নিন্দা জানিয়েছেন। নিজের ফেসবুক পোস্টে তিনি লেখেন, ‘আইইডিসিআরের পরিচালকের কার্যালয়ে ঢুকে তার কক্ষের ভেতরে তাকে মারধর করেছেন ড্যাবের কর্মীরা। মব সৃষ্টি করে এ ঘটনা ঘটানো হয়েছে।’


তিনি বলেন, ‘আজকে বেলা ১১টায় আইইডিসিআরে যে ঘটনা ঘটেছে সমাজের একটি বিশেষায়িত উচ্চশিক্ষিত সমাজেও যদি এ ধরনের মব স্পষ্ট দিবালোকে বেপরোয়াভাবে তৈরি করা হয়, তাহলে ভাবা যায় দেশ কোন পথে?’


তিনি আরও বলেন, ‘একের পর এক অঘটন ঘটে চলেছে। রাড্ডা মেডিকেল সেন্টার ভাঙচুর ও লুটপাটের ক্ষত এখনো তাজা। এর মধ্যে সরকারি দলের চিকিৎসকদের সংগঠন ড্যাবের নেতাকর্মীরা যে ঘটনা ঘটিয়েছেন, তা বাংলাদেশের চিকিৎসাসেবার ইতিহাসে একটি কালো অধ্যায় রচনা করেছে। 


এ ঘটনাকে সীমালঙ্ঘন, ধৃষ্টতা ও অপরাধমূলক কাজ উল্লেখ করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘এর সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার হতে হবে। অন্যথায় ভঙ্গুর স্বাস্থ্যসেবা কোনোভাবেই ঘুরে দাঁড়াতে পারবে না।’




শেয়ার করুন